“অন্ধকার – আলোর পথে!”


 “অন্ধকার – আলোর পথে!”

কালবৈশাখী ঝড়ের ঠিক আগ মুহূর্তে যেমন আকাশ নিকষ কালো হয়, চারপাশ যেমন অন্ধকারে চেয়ে যায় ঠিক তেমনি আমার জীবনে অন্ধকার নেমে এসেছিল! সবকিছু যখন গভীর অন্ধকার হয়ে যায় তখন মানুষ যেমন দিশাহারা হয়ে যায় তেমনি আমিও দিশাহারা হয়ে বারবার আলোর জন্য *হাতরে মরেছি! কি করব? কার কাছে যাব? আমার ক্যারিয়ার তখন হুমকির মুখে! কোনো কিছুই ভালো লাগে না! গভীর বিষাদ ঘিরে ফেলেছিল আমাকে! আমার এখনো মনে আছে, টানা চারদিন ঘর অন্ধকার করে বসেছিলাম!  কারও সাথে কোনো কথা নেই, যোগাযোগ নেই! বাবা-মা আমার কথা চিন্তা করতে করতে প্রায় শুকিয়ে গিয়েছিলেন! চিন্তা করবেননা কেন! তাদের হাসি-খুশি ছেলেটা যে উনিশ বছর পার করে দিয়েছে যাকে কখনো কান্না করতে দেখেননি আর সেই ছেলেটি ঘর অন্ধকার করে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্না করছে! 


চারদিন পর আমার শরীর চরম বিপর্যয়ের দিকে চলে গেল।  মাথা তুলে দাঁড়াতে পারিনা এমনকি বসতেও পারিনা! বারবার গভীর আচ্ছন্নের মতো হয়!  কখনো কখনো মনে হয় বোরখা পরিহিত কেউ একজন আমাকে কি যেন বলতে চাচ্ছেন। কিন্তু কথাগুলো আমার কান পর্যন্ত পৌঁছাচ্ছে না। আবার কখনো কখনো মনে হয় শাদা পাঞ্জাবি পরিহিত কেউ একজন আমার দিকে এগিয়ে আসছে। তখন আমি ভয়ে কাতর হয়ে যাই! তাহলে কি মৃত্যু এসে গেল! এভাবে আরও একটি দিন কেটে গেল ; আধো ঘুম আধো জাগ্রত অবস্থায়! 


তারপর? তারপর আমার আর কিছু মনে নেই!  দুদিন পর নিজেকে হাসপাতালে আবিষ্কার করি। চোখ মেলতেই দেখেছি আমার পরিবার, আত্মীয় এবং বন্ধুরা আমার চারপাশে। সবার চোখে ভয়! তাদেরকে কি কিছু বলা যায়! আমি কি বলতে পারিনা যে, আমি ঠিক আছি! হ্যা তাদেরকে তো বলতে হবে! কিন্তু কথা বলতে চেষাতা করার পর বুঝতে পারলাম আমার কথা বলার শক্তি নেই! আবার চোখ বন্ধ হয়ে আসল। গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলাম। কখনো কখনো ঘুম ভেঙ্গে গেলে দেখি পাশে বাবা-মা বসে আছেন ,কোনো সময় আত্মীয়রা বসে আছেন আবার কখনো কখনো বন্ধুদেরও দেখতে পাই। আবারও গভীর ঘুমে তলিয়ে পরি। এভাবেই কেটে গেল আরও সাতদিন। তারপর আমাকে হাসপাতাল থেকে রিলিজ নিয়ে বাড়িতে নেওয়া হল। বাড়িতে *দেখাশোনা করার জন্য একজন নার্সও রাখা হল। কোনো কিছু ভালো লাগে না তবুও বাবা-মা, আত্মীয় ও বন্ধুরা প্রতিদিন আমাকে সময় দিতেন। এভাবে আরও দশদিন কেটে যাওয়ার পর সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠলাম। বন্ধুরা আমাকে বেড়াতে নিয়ে গেল। সারাদিন ঘুরাঘুরি করার পরও আমার মন বিষণ্ণ থেকে গেল। যেন, কোনো একটা কিছু আমার অপূর্ণ হয়ে গেছে।  সারাক্ষণ ইচ্ছা ছিল আগের মতো বন্ধুদের সাথে জমিয়ে আড্ডা দিব। কিন্তু তা পারিনি! 


প্রায় একমাস পর নিজে নিজেই বাইরে বের হয়েছিম। যদিও বাবা-মা জোর করছিলেন বন্ধুদের মধ্যে কাউকে সাথে নিয়ে বের হই। কিন্তু তা না শুনে আমি একা একাই বের হয়েছিলাম। সারাদিন শহরে শহরে রিকশা নিয়ে ঘুরেছি। তারপর দিনও সন্ধ্যা পর্যন্ত শহরে শহরে ঘুরেছি। আমার মন বারবার আমার অপূর্ণতাকে খুঁজতে শুরু করে। এর মধ্যে কানো কোনো রাতে ঘুমের মধ্যে আগের মতো বোরখা পরিহিত কেউ একজন কিছু বলার চেষ্টা করে। কিন্তু আমার কান পর্যন্ত তা পৌঁছায় না। তার আগেই আমার ঘুম ভেঙ্গে যায়। সে রাতে আমি আর ঘুমাতে পারিনা। সারাটি রাত আমি ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্না করি! 


একদিন বিকালের ঘটনা। আমার এখনো স্পষ্ট মনে আছে আমি হাটতে হাটতে একটি গলির পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম তখন-ই আমার কানে ভেসে আসছিল, “আমার প্রিয় যুবক ভাইয়েরা! তোমরা কোথায় আছ? অন্ধকারে না-কি আলোতে? তোমরা কেন এত কষ্ট পাচ্ছ? তোমাদের যিনাকারী সঙ্গিনীর জন্য? না-কি আল্লাহর সান্নিধ্যের জন্য? মনে রাখ, আল্লাহ তোমাকে নিজে নিজেকে কষ্ট দেওয়ার জন্য তৈরি করেননি। তোমাদের কি একটুও ভয় করে না সেই দিনের কথা ভেবে! যেদিনে আল্লাহ আমাদের বিচার করবেন। যিনাকারীদের আগুনে ফেলে দেওয়া হবে, যেখানে তারা চিরকাল থাকবে। প্রিয় যুবক ভাইয়েরা! একবার চিন্তা করুন আমরা কি উত্তপ্ত আগুনের মধ্যে চিরকাল থাকতে পারব? ফিরে আসুন সেই পথ থেকে যে পথে হাটলে আগুনে পুড়তে হবে! ফিরে আসুন সেই পথে যে পথে চির শান্তি। মনে রাখ, আল্লাহ মহা দয়ালু! আল্লাহ তোমার কথা শুনছেন। অচিরেই তুমি তোমার ফল ভোগ করবে।’’ 


সেদিনের এই কথাগুলো আমাকে ছিঁড়ে ছিঁড়ে খাচ্ছিল। প্রতি রাত্রেই আমি নিজেকে প্রশ্ন করি আমি কি সেই অন্ধকার পথে হাটছি? যে পথে হাটলে চিরকাল উত্তপ্ত আগুনে পুড়তে হবে! হ্যা, আমি তো সেই পথে হাটছি! আমি অন্ধকারে ডুবে আছি!  অরিনের জন্য আমি কেন নিজেকে তিলে তিলে শেষ করে দেব? আমাকে তো আল্লাহ এ জন্য তৈরি করেননি! সেদিন আমি নিজেকে প্রশ্ন করে অনেক কেঁদে কেঁদে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। স্বপ্নে আবার সেই বোরখা পরিহিত কেউ একজন আমাকে বলছে, “তুমি তো অন্ধকারের পথে হাটছ। সেই অন্ধকারের পথে যে পথে হাটলে চিরকাল উত্তপ্ত আগুনে পুড়তে হবে! ফিরে এস অন্ধকারের পথ থেকে। মনে রেখ, আল্লাহ মহান দয়ালু! তোমার কথা শুনছেন!” কথা গুলো শেষ হওয়ার পরই আমার ঘুম ভেঙ্গে যায়। তখন চারিদিক থেকে আজানের মধুর সুর আসছিল। আমার মন বারবার বলে উঠল আগে তো এমন সুন্দর সুর শুনিনি! আমার চোখ থেকে পানি পরতে শুরু করল। 


এরপর থেকে আমি আমার জীবনের নতুন দিগন্তে চলতে শুরু করি। সেদিনের ফজরের নামাজে অনেক কান্না করেছি। আল্লাহতালার কাছে দোয়া করেছিলাম, “ইয়া রহমান, ইয়া রাহিম! তুমি তো মহান দয়াময়! তোমার এই গুনাহগার বান্দাকে দয়া কর, মাফ কর। তুমি তো মহান ক্ষমাশীল! ইয়া আল্লাহ! তুমি তো মহান ক্ষমতাবান! তুমি আমার জন্য যা সহজ, যা প্রয়োজন তা তুমি দিও! তোমার নির্ধারিত পথে আমাকে চলার তৌফিক দান কর!” 


তিন বছর পর আমি পুরুপুরি কোরআনে হাফেজ হই! এর মধ্যে আমার বাবা-মা আমার বিয়ের জন্য কনে ঠিক করে রাখেন। বিয়ের রাতে আমি আল্লাহর দয়ার অভিভূত হয়েছি! আমি আমার চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না যে, যার জন্য প্রায় চার বছর আগে নিজেকে তিলে তিলে শেষ করতে চেয়েছিলাম সেই আজ আমার জীবনসঙ্গী! বিয়ের আগে বাবা-মা কনে দেখার জন্য বললেও আমি দেখিনি। আমার বিয়ের রাতে সিজদায় গিয়ে অনেক কেঁদেছিলাম। আমার জীবনসঙ্গীর চোখেও দেখেছিলাম পানি টলোমলো করছিল। 


আজ আমার জীবনে কোনো দুঃখ নেই! আল্লাহ আমাকে সবকিছু দিয়েছে! দিয়েছে এক পুত্র সন্তান এবং এক কন্যা সন্তান, দিয়েছেন অনেক বন্ধু ও প্রিয়জন। কিন্তু কেড়ে নিয়েছেন আমার বাবা-মাকে। আল্লাহর কাছে প্রতিদিন প্রার্থনা করি আমার আর কিচ্ছু চাওয়ার নেই, শুধু চাই আমার বাবা-মায়ের কবরকে যে জান্নাতের বাগান বানিয়ে দেন এবং আমার সন্তানরা , আমার জীবনসঙ্গী ও আমি যেন আলোর পথে চলতে পারি। 


ডায়েরি পড়তে পড়তে কখন যে নিহানের চোখে পানি এসে গেল তা বুঝতেই পারল না। ভার্সিটিতে সিএনজি দিয়ে যাওয়ার সময় পাশে থাকা লোকটি ভুল করে ফেলে যায় ডায়েরিটি। ডায়েরির কভার দেখে লোভ সামলাতে না পেরে পড়ে ফেলে সে। এখন তার মনে হচ্ছে, “নিশ্চয় এটা আল্লাহর পূর্বপরিকল্পিত! আমিও কি সেই অন্ধকার পথে হাটছি না? যে পথে হাটলে চিরকাল উত্তপ্ত আগুনে পুড়তে হবে! হ্যা, আমি তো সেই পথে হাটছি! নাতিশার সাথে জড়িয়ে পরেছি যিনার কাজে! আমাকে আলোর পথে আসতে হবে!” 


“অন্ধকার – আলোর পথে!”


লিখেছেনঃসাইদূল হক (অঙ্কুর পাঠক ফোরাম) 




(Shahitto, bangla shahitoo, Shahitya Net, shahitto net, suto golpo, chuto golpo, bangla short story)